বিশেষ প্রতিবেদক: সিলেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ, পর্যটনসমৃদ্ধ ও সীমান্তবর্তী উপজেলা গোয়াইনঘাট। রূপসী জাফলং, বিছনাকান্দি আর রাতারগুলের মতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এই এলাকা শুধু পর্যটনের জন্যই নয়, ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিয়োগ নিয়ে সম্প্রতি চরম বিতর্ক ও জনমনে তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।
সাধারণ মানুষের প্রশ্ন— গোয়াইনঘাট থানা কি কোনো ‘মধুচন্দ্রিমা’ নাকি সর্ষের ভেতর ভূত লুকিয়ে আছে? বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে হাজার হাজার যোগ্য, সৎ এবং দক্ষ ইন্সপেক্টর থাকা সত্ত্বেও কেন বারবার অতীতে এখানে দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তিদেরই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ওসির চেয়ারে বসানো হচ্ছে?
সম্প্রতি গোয়াইনঘাট থানার সাবেক ওসি (তদন্ত) ওমর ফারুককে পুনরায় এখানকার মূল ওসি হিসেবে বদলি করে আনা হয়েছে। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে পুরো উপজেলা জুড়ে সাধারণ মানুষ, সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র মিশ্র প্রতিক্রিয়া এবং ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসনের কাছে স্থানীয়দের সোজা সাপটা প্রশ্ন— পুলিশ বাহিনীতে কি নতুন, সৎ ও যোগ্য কর্মকর্তার আকাল পড়েছে? নতুন কোনো কর্মকর্তাকে এই স্পর্শকাতর এলাকার দায়িত্ব দিলে কি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হতো না, নাকি নেপথ্যের কোনো সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর স্বার্থে আঘাত লাগত? গোয়াইনঘাটে এমন কী ‘মধু’ বা বিশেষ আকর্ষণ লুকিয়ে আছে, যার কারণে পুরোনো কর্মকর্তারাই বারবার নানা তদবিরের মাধ্যমে এখানেই নোঙর ফেলতে মরিয়া হয়ে ওঠেন?
সাবেক কর্মকর্তাদের পুনরায় নিয়োগের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় আপত্তির জায়গাটি হলো ‘সিন্ডিকেটের পুনর্বাসন’। গোয়াইনঘাট এলাকাটি পাথর কোয়ারি, বালু মহাল এবং সীমান্ত চোরাচালানের জন্য দীর্ঘকাল ধরেই আলোচিত-সমালোচিত। অতীতে যারা এখানে দায়িত্ব পালন করেছেন, স্থানীয় প্রভাবশালী মহল, বালু-পাথর খেকো এবং চোরাচালান চক্রের সাথে তাদের একটি ‘চেনা লাইন’ বা গভীর সখ্যতা তৈরি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সাধারণ মানুষের প্রবল আশঙ্কা, পুরোনো মুখ ফিরে আসার অর্থ হলো সেই পুরোনো সিন্ডিকেটগুলোর নতুন করে সক্রিয় হয়ে ওঠা। নতুন করে এসে তারা পূর্বপরিচিত অবৈধ ব্যবসায়ীদেরই পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে প্রশ্রয় দেবেন, যা এলাকার পরিবেশ, অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে সাধারণ মানুষের প্রধান প্রত্যাশা নিরপেক্ষতা। কিন্তু একজন কর্মকর্তা যখন একই কর্মস্থলে বারবার ফিরে আসেন, তখন তার পূর্বের কর্মকালের সম্পর্কগুলো প্রভাব ফেলতে বাধ্য। কার সাথে কেমন সম্পর্ক ছিল, কে অতীতে তাকে আর্থিকভাবে বা সামাজিকভাবে সহযোগিতা করেছিল— এগুলোর ওপর ভিত্তি করে সাধারণ মানুষ আইনি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে চরম বৈষম্য ও হয়রানির শিকার হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ভুক্তভোগীরা। এতে পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাহীনতা আরও প্রকট আকার ধারণ করতে পারে।
সাধারণ জনগণের মনে স্বাভাবিকভাবেই এই যৌক্তিক প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছে যে, ক্ষমতার পালাবদল বা লটারি— যেভাবেই হোক না কেন, কেন বিশেষ কিছু ব্যক্তিই বারবার এই গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তবর্তী অঞ্চলের দায়িত্ব পান? এর পেছনে কি বিশাল কোনো আর্থিক লেনদেন বা অদৃশ্য শক্তির শক্তিশালী তদবিরের খেলা সচল রয়েছে? একটি নির্দিষ্ট থানায় পদায়নের জন্য এই মরিয়া চেষ্টা প্রমাণ করে যে, এখানে জনসেবার চেয়ে ব্যক্তিগত লাভালাভের হিসাব-নিকাশই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গোয়াইনঘাটের সাধারণ জনগণ কোনো বিশেষ ব্যক্তির বা সিন্ডিকেটের আধিপত্য মেনে নিতে রাজি নন। তাদের দাবি অত্যন্ত স্পষ্ট— তারা চান সম্পূর্ণ নতুন, নিরপেক্ষ, প্রভাবমুক্ত এবং সৎ কোনো পুলিশ কর্মকর্তা এসে গোয়াইনঘাটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির হাল ধরুক। সীমান্ত চোরাচালান, মাদকের ভয়াবহ বিস্তার এবং বালু-পাথরের অবৈধ বাণিজ্য সমূলে উৎপাটন করতে একজন নতুন এবং সাহসী ওসির কোনো বিকল্প নেই।
প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে স্থানীয়দের আকুল আবেদন, গোয়াইনঘাটবাসীর এই ক্ষোভ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়াকে গুরুত্বের সাথে মূল্যায়ন করা হোক। একটি সুন্দর পর্যটন এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তকে গুটিকয়েক দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের হাত থেকে মুক্ত রাখতে চেনা মুখগুলোর বাইরে গিয়ে নতুন, প্রতিশ্রুতিশীল ও সৎ কাউকে দ্রুত দায়িত্ব দেওয়া হোক। অন্যথায়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার বদলে গোয়াইনঘাট আবারও অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হতে পারে।
Leave a Reply